বেইলআউট তহবিলে সরকার ব্যাংক ঋণগ্রহণে ঝুঁকছে

প্রকাশ :

সংশোধিত :

অসহায় ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) সংকট মোকাবিলায় বিশেষ বন্ড ও বিল নিলামের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের ফলে সরকারি ব্যাংক ঋণগ্রহণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে।

রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রবৃদ্ধি থাকায় নতুন আর্থিক চাপ মোকাবিলায় অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়মিত সময়সূচির বাইরে গিয়ে বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে সরকারি সিকিউরিটিজ (জি-সেক) ইস্যু করে ঋণ নিচ্ছে।

অতীতে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সমস্যায় পড়া পাঁচটি তারল্য সংকটাপন্ন ইসলামি ব্যাংকের একত্রীকরণে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ এবং সংকটে থাকা নয়টি এনবিএফআই বন্ধ করার সম্ভাব্য ব্যয় মেটাতে আজ বুধবার (১০ ডিসেম্বর) ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের বিশেষ নিলামের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২৭ নভেম্বর সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়।

এছাড়া ১৬ নভেম্বর নির্ধারিত নিলামে ঘোষিত ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পাশাপাশি মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত ১,২৮৯ কোটি টাকা সংগ্রহ করে—অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বর্ধিত ব্যয় সামাল দিতে চলতি বাজেটে ব্যাংক-ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ১.০৪ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে বাড়িয়ে ১.১৭ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি (২৫ হাজার কোটি টাকা)।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংকের একত্রীকরণে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে সহায়তা দিতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্বল অবস্থায় থাকা নয়টি এনবিএফআই বন্ধ করতে সম্ভাব্য ৫ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয়ও লাগতে পারে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “টাকা আসবে কোথা থেকে? রাজস্ব আদায় বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু এ ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত নয়। তাই বিশেষ নিলাম করতে হচ্ছে। এতে কোনো সমস্যা নেই।” 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয় বা প্রশাসনিক ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ার তেমন কোনো লক্ষণ নেই।

তিনি মন্তব্য করেন, “তাহলে হঠাৎ সরকারি ব্যাংক ঋণ কেন বাড়ছে? সম্ভবত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ও নয়টি এনবিএফআই লিকুইডেশনের ব্যয়ের কারণেই এমনটা হচ্ছে—এর পাশাপাশি সামনে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার ব্যয়ও থাকতে পারে।”  

তিনি মনে করেন, সরকার বাজেট সহায়তা হিসেবে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করছে, যা সঠিক নয়। তিনি বলেন, “বাজেট সহায়তা এলে নীতি-সংস্কারের সুযোগ থাকে এবং সঠিকভাবে করলে এর প্রভাব বিনিয়োগ প্রকল্পের মতোই ইতিবাচক হতে পারে।” 

তার মতে, এই অর্থায়ন কৌশল ব্যাংক খাতে চাপ বাড়াবে এবং মানি মার্কেটে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, এমন আশঙ্কার সুযোগ কম; কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার ক্রয় করে ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়াচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২ মিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে এবং এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে ২৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মতো তারল্য ঢুকেছে।

তিনি আরও মন্তব্য করেন, “তাই ৫,০০০ কোটি টাকার বিশেষ নিলামে ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণে কোনো সমস্যা হবে না, ক্রাউডিং আউটের ঝুঁকিও নেই।”  

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, চলমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে সরকারি বিনিয়োগ কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বা পিপিপি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থ ব্যবস্থাপনায় ‘স্পেস’ তৈরি করা উচিত।

তিনি বলেন, আর্থিক খাত সংস্কারে একীভূতকরণ, সংযুক্তি ও বন্ধ হওয়া অনিবার্য, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বাজারভিত্তিক সমাধান খোঁজা। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতের হাতে একীভূতকরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব দেন, যা পুনঃমূলধনীকরণের চাপ কমাতে পারে।

একইসঙ্গে, যদি একটি ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন করা যায়, তবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কাছে খারাপ সম্পদের একটি অংশ বিক্রি করা সম্ভব হবে।

অর্থনীতিবিদ বলেন, “এতে সরকারি চাপ অনেকটাই কমে আসবে।” 

jubairfe1980@gmail.com

সর্বশেষ খবর