বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে স্টার্টআপ বিনিয়োগ কোম্পানি
প্রাথমিক মূলধন ৪২৫ কোটি টাকা, তিন ক্যাটাগরিতে অর্থ পাবেন উদ্যোক্তারা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

দেশে স্টার্টআপ বা নতুন ব্যবসায় অর্থায়ন এবং সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোকে সহায়তা করার লক্ষ্যে ৪২৫ কোটি টাকার প্রাথমিক পরিশোধিত মূলধন নিয়ে একটি ইক্যুইটি-ব্যাকড (শেয়ার মূলধন ভিত্তিক) পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কর্মকর্তা ও ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, তহবিলের অভাবে মূলত অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে বলে মনে করা হয় এমন স্টার্টআপ খাতকে সহায়তা করতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থায়নে কয়েকদিন আগে ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ নামে কোম্পানিটি গঠন করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক দিক থেকে কম গুরুত্ব পাওয়া খাতগুলোতে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সহায়তায় কোম্পানি গঠনের প্রক্রিয়াটি সহজতর করছে। ইক্যুইটি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এই স্টার্টআপ উদ্যোগের শেয়ারহোল্ডার বা অংশীদার হবে।
ইক্যুইটি বিনিয়োগ বলতে কোনো কোম্পানির শেয়ার বা স্টক কিনে শেয়ারহোল্ডার হওয়াকে বোঝায়। শেয়ারের মালিকানার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির সম্পদ ও মুনাফায় অংশীদারিত্ব লাভ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন হবে ২০০০ কোটি টাকা, তবে এটি ৪২৫ কোটি টাকার প্রাথমিক পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করবে।
নবগঠিত কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ হবে ৯ সদস্যবিশিষ্ট। এতে ৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং ৪ জন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকবেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন এই পর্ষদের সভাপতিত্ব করবেন।
বোর্ডে প্রতিনিধিত্বকারী অন্য চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক হলো প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), সোনালী ব্যাংক এবং পূবালী ব্যাংক। প্রাইম ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজিম এ চৌধুরী এই বিনিয়োগ কোম্পানির সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ৩৯টি বাণিজ্যিক ঋণদাতার ৪২৫ কোটি টাকার প্রাথমিক তহবিল নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ‘বাংলাদেশ স্টার্ট-আপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি’ অবশেষে গঠিত হয়েছে।
তিনি জানান, কোম্পানিটি গত ৭ ডিসেম্বর যৌথমূলধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে ইনকরপোরেশন সার্টিফিকেট বা নিববন্ধন সনদ পেয়েছে। অর্থায়ন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে প্রতিষ্ঠানটির এখন সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া এবং একটি যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা প্রয়োজন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, "আমরা এবিবি সদস্যদের যত দ্রুত সম্ভব বোর্ড সভা করে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিতে বলেছি। আমরা এই মাসের মধ্যেই কার্যক্রম শুরু করার ব্যাপারে আশাবাদী।"
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার উদ্ধৃতি দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার ১ শতাংশ স্টার্টআপ অর্থায়নের জন্য আলাদা করে রাখতে হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন কারণে অব্যবহৃত থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, "দেশে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করতে একটি কাঠামোগত এবং স্টার্টআপ-বান্ধব উপায়ে এই অর্থ কাজে লাগাতেই নতুন কোম্পানিটি গঠন করা হয়েছে।"
বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, নতুন এই ভিসি (ভেঞ্চার ক্যাপিটাল) ফার্ম চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালের জগতে প্রবেশ করছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক পরিশোধিত মূলধন ৪২৫ কোটি টাকা হলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ পাওয়া গেলে মোট তহবিলের পরিমাণ ৬৫০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, "আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অভিনব ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও আইডিয়া থাকা মানুষদের জন্য এটি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।"
নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার জানান, ইক্যুইটি বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে তারা বিনিয়োগ কমিটিতে বৈশ্বিক ভিসি অর্থায়নের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিদেশি পরামর্শকদের নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন।
জনাব আরেফিন বলেন, "আমি কোম্পানিটি নিয়ে খুবই আশাবাদী। আমরা চাই সবাই এই উদ্যোগ থেকে সহ-বিনিয়োগ (কো-ইনভেস্টমেন্ট) পাক। আমরা যদি বিকাশ, পাঠাও এবং চালডালের মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে সাহায্য করতে পারি, তবে তা হবে একটি বড় অর্জন।"
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে 'শিখো'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহির চৌধুরী বলেন, যদি এই গতি ধরে রাখা যায়, তবে ব্যাংকের মুনাফার ১ শতাংশ দিয়ে নতুন এই ভেঞ্চার ফান্ড গঠন বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি "মাইলফলক মুহূর্ত" হতে পারে।
জনাব চৌধুরী বলেন, "এটি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক একটি পদক্ষেপ। এটি উদ্ভাবনকে লালন করা এবং ইকোসিস্টেমের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়।"
তিনি নতুন এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে মাসরুর আরেফিনের নিয়োগেরও প্রশংসা করেন। আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ কমিটি সাজাতে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসার বিষয়ে আরেফিনের প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, "স্থানীয় প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বমানের দক্ষতার মূল্য উভয়ই বোঝেন এমন একজনকে নেতৃত্বে পাওয়াটা এই উদ্যোগকে একটি শক্ত ভিত্তি দেয়।"
শাহির চৌধুরী আরও বলেন, এখন তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নতুন কোম্পানিকে মূলধন যোগান দেওয়া, যাতে বোর্ড পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের সাথে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করতে পারে।
"আমরা যদি বোর্ডকে দ্রুত ক্ষমতায়ন করতে পারি, তবে এই প্রতিষ্ঠানটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি উচ্চ প্রবৃদ্ধির বাংলাদেশি স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা করবে এবং অর্থবহ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে সাহায্য করবে। এটাই আমাদের সামনে সুযোগ।"
অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের নিট মুনাফার ১ শতাংশের সমপরিমাণ ইক্যুইটি তহবিল প্রদান করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র মতে, ২১ বছরের বেশি বয়সী স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা তিনটি ক্যাটাগরিতে অর্থায়নের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন: ২ কোটি, ৫ কোটি এবং ৮ কোটি টাকা।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.