১৭ বছরের অপেক্ষার অবসান
৩৫ হাজার কোটি টাকায় হচ্ছে দ্বিতীয় তেল শোধনাগার
কমবে আমদানি নির্ভরতা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

দেশীয় অর্থায়নে আনুমানিক ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় তেল শোধনাগার প্রকল্পটি এখন দৃশ্যমান। পরবর্তী সভায় এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
২০০৮ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হওয়ার পর প্রায় ১৭ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের এই নির্ণায়ক উদ্যোগের মাধ্যমে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় শোধনাগার ইউনিট স্থাপনের প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য একনেকের সামনে পেশ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বার্ষিক ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন এই নতুন শোধনাগার প্রকল্পটি আগামী মঙ্গলবারের একনেক সভার আলোচ্যসূচিতে (এজেন্ডা) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের (ইএমআরডি) একজন কর্মকর্তা জানান, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র বিদ্যমান শোধনাগারটির ক্ষমতা ১৫ লাখ টন, যা দেশের বর্তমান বার্ষিক চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারে।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে মোট পরিশোধন ক্ষমতা বেড়ে ৪৫ লাখ টনে দাঁড়াবে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাক্কলিত ১ কোটি ৭ লাখ ৯০ হাজার টন বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশ পূরণ করবে এবং এর মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
প্রস্তাবিত এই ইউনিটের লক্ষ্য হলো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন এবং আমদানিকৃত পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা।
ইএমআরডি কর্মকর্তারা জানান, এই প্ল্যান্টটি ইউরো-৫ মানের অকটেন ও ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করবে, যাতে সালফারের পরিমাণ থাকবে ১০ পিপিএম-এর নিচে। এটি বৈশ্বিক পরিবেশগত মান বজায় রাখবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মল বাতাস নিশ্চিত করবে।
এক কর্মকর্তা বলেন, "প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানি কমিয়ে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, "এছাড়া, অপরিশোধিত তেল থেকে তরল জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত উপজাত (value-added byproducts) প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) আয় বাড়াতে সহায়তা করবে।"
ইএমআরডি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড (এএলসি) এবং মারবান ক্রুডকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে এর মৌলিক নকশা সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া, নরওয়ে এবং নাইজেরিয়াসহ অন্যান্য উৎস থেকে আসা অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, "দ্বিতীয় ইউনিটটি রাশিয়ার ইউরালস ক্রুড বা নাইজেরিয়ার ব্রাস রিভার ক্রুড পরিশোধনের আগে আলাদাভাবে ফুটিয়ে (বয়েলিং) প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হবে।"
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর সরকার ২০১০ সালে প্রথমে ১৩ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) কাছে অর্থায়ন চেয়েছিল। পরবর্তীতে বিদেশি সহায়তা পাওয়ার আশায় ২০২৩ সালে প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করে এর ব্যয় ধরা হয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা।
তবে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবটি পরে প্রত্যাহার করা হয়। পূর্ববর্তী প্রশাসনের পতনের পর ওই শিল্পগোষ্ঠীটি সরকারের সুনজর হারায়।
সম্প্রতি ইএমআরডি সম্পূর্ণ দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য ৪২ হাজার ৯৭৪ কোটই টাকার সংশোধিত প্রাক্কলনসহ প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পুনরায় জমা দেয়।
গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের উপাদান-ভিত্তিক ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হয়। পিইসি-র পরামর্শ অনুযায়ী, ইএমআরডি ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায় প্রকল্পটি পুনরায় জমা দেয়। এর মধ্যে ২১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা সরকারি ঋণ এবং ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে, ফলে ৭ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, "প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে ইআরএল বছরে ৩০ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে এবং পরিবেশবান্ধব পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হবে, যা জনগণের জন্য পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে।"
এতে আরও বলা হয়, এই শোধনাগার থেকে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি, ৬ লাখ টন গ্যাসোলিন, ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল, ১১ লাখ টন ডিজেল এবং দেড় লাখ টন বিটুমিন উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যগুলোর আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.