শনিবার শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বসছে বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশ :

সংশোধিত :

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের ইরান আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে সংকট ব্যবস্থাপনার কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে আগামীকাল (শনিবার) দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও থিংক ট্যাংকগুলোর (গবেষণা প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নীতি সুদহার (পলিসি রেট) সংশোধনের জন্য ডাকা মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) সভা স্থগিত করার ঠিক এক দিন পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় উচ্চ নীতি সুদহার সমন্বয়ের লক্ষ্যে গত বুধবার এমপিসি সভা ডেকেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তবে অজ্ঞাত কারণে সভাটি স্থগিত করা হয়।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রগুলো জানিয়েছে, এমপিসি সভাটি এমন এক সময়ে ডাকা হয়েছিল যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম সংকটের মুখে পড়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এমপিসি সদস্য এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, সম্প্রতি স্বল্প সময়ের নোটিশে এমপিসি সভা ডাকা হয়েছিল, কিন্তু পরে তা বাতিল করা হয়।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, "সভা স্থগিত করার সঠিক কারণ আমার জানা নেই। আমি এটাও শুনেছি যে, ঈদুল ফিতরের পর সভাটি অনুষ্ঠিত হতে পারে।"

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বুধবারের স্থগিত হওয়া এমপিসি সভায় নীতি সুদহার ২৫ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর কথা ছিল।

তিনি বলেন, "বর্তমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সুদহার কমানোর এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত আমাদের অনেককেই অবাক করেছিল। সৌভাগ্যবশত, সভাটি বাতিল করা হয়েছে।"

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্তে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে—এমন সমালোচনার ভয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে।

তবে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এখন অর্থনীতিবিদ এবং থিংক ট্যাংকগুলোর সঙ্গে একটি বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলার জন্য সংকট ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়নের আগে সার্বিক পরিস্থিতি এবং এই যুদ্ধের নানামুখী প্রভাব মূল্যায়ন করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি, আকস্মিক এই এমপিসি সভা অর্থনীতিবিদ এবং মুদ্রাবাজার বিশ্লেষকদেরও অবাক করেছিল। তাদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ছিল মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান পরিস্থিতি এবং সেই সঙ্গে দেশের মূল্যস্ফীতির প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এই মুহূর্তে নীতি সুদহার কমানোর কোনো যুক্তি নেই। কারণ, মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম, শিপিং খরচ এবং উচ্চ বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধির কারণে ব্যবসার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে লেনদেনের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা বিওপি) ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যেসব দেশ সম্প্রতি সুদহার কমানোর প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল, তারাও এখন উদীয়মান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে নতুন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকছে।

তিনি যোগ করেন, "আমি মনে করি আমাদের আরও অপেক্ষা করা উচিত। অন্যথায় আগামী দিনগুলোতে আমরা বিপদে পড়তে পারি।"

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, চলমান দেশীয় ও বৈশ্বিক কারণগুলোর জন্য এই মুহূর্তে নীতি সুদহার কমানো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তিনি আরও বলেন, উচ্চ নীতি সুদহার বজায় রাখা সত্ত্বেও গত কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে, আর আগামী দিনগুলোতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ আরও বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে, যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

তিনি আরও বলেন, "আমার মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্ক থাকা উচিত এবং এখনই প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতির দিকে যাওয়া ঠিক হবে না।" 

jubairfe1980@gmail.com

সর্বশেষ খবর