আইএমএফের ঋণের শর্তে হতবুদ্ধি আলোচকরা, চলছে পুনর্বিবেচনা
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নেবেন অর্থমন্ত্রী

প্রকাশ :
সংশোধিত :

কঠিন শর্তের বাজেট-সহায়তা তহবিল পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তগুলো সরকার কতটা মেনে নিতে পারবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চাইবেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফের ঋণের শর্তগুলো আলোচকদের একপ্রকার হতবুদ্ধি করে তোলায়, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এই আলোচনায় তার দলের নেতৃত্ব দেবেন।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বসন্তকালীন বৈঠকে (স্প্রিং মিটিং) অংশ নেওয়া এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আইএমএফের সমস্ত শর্ত পুরোপুরি মেনে নেওয়ার সুযোগ খুব কম থাকায় এই সিদ্ধান্তটি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে।
ওই কর্মকর্তা দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, "সরকার আইএমএফের শর্ত মেনে নেবে কি না, তা এখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।"
২০২৬ সালের জুনে ঋণ প্যাকেজ থেকে পরবর্তী দুই কিস্তির অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে আইএমএফের বেঁধে দেওয়া মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভর্তুকি প্রত্যাহার, কর ও জিডিপির অনুপাত ৯.২ শতাংশে উন্নীত করা এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার গ্রহণ করা।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি এবং রপ্তানির নিম্নগামী প্রবণতার কারণে সরকার আগামী বাজেটে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে মনে হয় না, ওই কর্মকর্তা জানান।
"আমরা এবার আইএমএফকে তাদের শর্তের ব্যাপারে বেশ অনড় দেখেছি। তারা সব ধরনের কর অব্যাহতি প্রত্যাহার এবং একক ভ্যাট হার চালুর দাবি জানিয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে হচ্ছে," উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা।
তবে আইএমএফের কর্মকর্তারা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ কমাতে সরকারকে তাদের মেয়াদের শুরুতেই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ৯.২ শতাংশে উন্নীত করতে হলে আগামী এক বছরের মধ্যে অতিরিক্ত ২ দশমিক ০ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সমন্বয় পরিষদের এক সভায় সরকার এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি) টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি।
তবে রাজস্ব কর্মকর্তারা চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা টাকা রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা করছেন।
ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনবিআর ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা আদায় করেছে, যা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫০ শতাংশ।
সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ আইএমএফ তিনটি মূল ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক অর্থায়ন মূলত আইএমএফের মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে। আইএমএফের বৈঠকের পর, করণীয়গুলো মেনে চলার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে এনবিআর চেয়ারম্যান রোববার এক জরুরি বৈঠক করেন।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এফই-কে বলেছেন, কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬.৫ শতাংশ থেকে ৯.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর রাজস্বে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
"বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশে আমরা এই শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করছি," ওই কর্মকর্তা বলেন।
তিনি আরও বলেন, সময়াবদ্ধ কর অব্যাহতি বাতিল করা আইনগতভাবেও সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাবের কারণে অর্থনীতি যখন চাপের মধ্যে রয়েছে, এমন সময়ে ভর্তুকি প্রত্যাহার করা বাস্তবসম্মত নয়।
"এই পর্যায়ে সম্পূর্ণ কর অব্যাহতি প্রত্যাহারের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা অর্থনীতির নেই।"
তবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মেয়াদের শুরুতেই কঠিন সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
"কেবল কর ফাঁকি রোধ করে বা বকেয়া আদায় করে আমরা রাতারাতি রাজস্ব বাড়াতে পারি না," এনবিআর কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় বলেন।
আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করতে রাজস্ব বোর্ড বর্তমানে নিবিড় অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা পরিচালনা করছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন পরামর্শ দিয়েছেন যে, আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের একটি রূপরেখা (রোডম্যাপ) তৈরি করা উচিত।
তবে, আগামী বছরের মধ্যে সব ধরনের কর অব্যাহতি প্রত্যাহারের মতো সব শর্ত বাস্তবায়ন করাকে তিনি কঠিন বলে মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, "আমাদের আইএমএফের তহবিল দরকার, তবে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে কারণ অর্থনীতি এখন এই চাপ সামলাতে প্রস্তুত নয়।"
তিনি উল্লেখ করেন যে, এমন অনেক খাত রয়েছে যাদের বিকাশের জন্য কর সুবিধা এবং রাজস্ব সহায়তা প্রয়োজন।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.