১৫ ব্যাংক ও বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের অডিটে অনিয়মের অভিযোগ, খতিয়ে দেখছে সরকার

প্রকাশ :

সংশোধিত :

বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর আর্থিক হিসাব নিরীক্ষাকারী (অডিট) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে সরকারি তদন্ত সংস্থাগুলো।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ১৫টি ব্যাংক ও কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের হিসাব নিরীক্ষা করা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ও অডিট ফার্মগুলো বর্তমানে তদন্তের তালিকায় রয়েছে।

তদন্তের তালিকায় রয়েছে— ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক। পাশাপাশি বড় করপোরেট গ্রুপের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় দেশের কয়েকটি নামকরা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মের তালিকা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)-এর কাছে পাঠিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও আয়ের উৎস যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর হাতে আসা একটি চিঠিতে এ তথ্য জানা গেছে।

এরই মধ্যে এনবিআর দেশের ৪০টি মাঠ পর্যায়ের কর অফিসকে নির্দেশ দিয়েছে, এসব অডিট ফার্মের আয়কর রিটার্ন পরীক্ষা করতে এবং ঘোষিত আয় ও সম্পদের তথ্য মিলিয়ে দেখতে। উদ্দেশ্য হলো,  কোনো অডিট প্রতিষ্ঠান আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ভুয়া বা সাজানো হিসাব বিবরণী তৈরি করেছে কি না তা খতিয়ে দেখা।

এই নির্দেশনা আসে দুদকের এক অনুরোধের পর, যেখানে জানতে চাওয়া হয়, কর অফিসগুলো আগে থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করেছে কি না। যেখানে তদন্ত হয়নি, সেখানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলকে (সিআইসি) তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এদিকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ থাকা ব্যাংক ও বড় প্রতিষ্ঠানের হিসাব প্রস্তুতকারী অডিট ফার্মগুলোর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

সোমবার দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইক্যাব) সভাপতি এনকেএ মোবিন বলেন, আর্থিক হিসাব তৈরিতে কোনো ত্রুটি বা নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে এফআরসি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

তিনি বলেন, “এফআরসি আমাদের সহায়তা চেয়েছে, আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।” তিনি জানান, সাম্প্রতিক এফআরসি কাউন্সিল বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

তবে হিসাববিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেশিরভাগ নামকরা অডিট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া হিসাব তৈরি করা খুবই অসম্ভব। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকতে পারে, তবে সেটি সাধারণ চিত্র নয়।

তাদের মতে, ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির চেয়ে বরং নিয়ম-কানুন মানার ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বলেন, “অডিটরদের সঙ্গে ব্যাংক কেলেঙ্কারির সুবিধাভোগীদের অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ কর অফিসগুলো খুঁজে পাবে এমন সম্ভাবনা কম, কারণ এমন লেনদেন সাধারণত হয় না।”

আইক্যাব সভাপতি এনকেএ মোবিন আরও বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে তাদের কাছে কোনো অভিযোগ পাঠানো হয়নি। তবে নিয়মিত অভিযোগ থাকলে আইক্যাবের মান নিয়ন্ত্রণ টিম তা খতিয়ে দেখে।

তিনি জানান, যদি এফআরসি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অভিযোগ আসে, তাহলে লাইসেন্স স্থগিতসহ পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬০০ জন প্র্যাকটিসিং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট রয়েছেন।

এফআরসি চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “এফআরসির বিশেষজ্ঞ দল ইতোমধ্যে অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করছে এবং তারা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।”

তিনি জানান, প্রথমে দলটি ৩০ জুন পর্যন্ত সময় চাইলেও এফআরসি ফেব্রুয়ারির মধ্যেই কাজ শেষ করতে বলেছে।

ড. ভূঁইয়া বলেন, “অডিটররা সমাজে সম্মানিত পেশাজীবী। তাই কাউকে যেন অন্যায়ভাবে বদনাম না করা হয়, সে বিষয়ে আমরা সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছি।”

যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের হিসাব এই ফার্মগুলো অডিট করেছে, তার মধ্যে রয়েছে— ক্রিসেন্ট গ্রুপ, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, সোনালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, জিভেনচি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, জিভেনচি গার্মেন্টস, জিভেনচি স্পিনিং মিলস, এনজয় জেড ডিজাইন, এনভয় ফ্যাশনস ও এনভয় গার্মেন্টস। 

doulotakter11@gmail.com

সর্বশেষ খবর